শিক্ষার্থীদের করোনা সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান দিলেন বেরোবির শিক্ষক উমর ফারুক
ইয়াসির আরাফাত শুভ
নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক প্রভাত বাংলা
'প্রিয়ন্তী ওঠো মা। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে। শীঘ্রই ওঠো মা।' ইট-পাথরের কর্কশ শহরে মায়ের এমন মিষ্টি ডাকে প্রতিদিন ঘুম ভাঙতো প্রিয়ন্তীর। কিন্তু অলসতা কাটতো না। ঘুমচোখেই মুখে রুটি গুজে দিতো মা।
দু-একবার না দিতেই, খাবো না বলে পালাতো মেয়েটা। তারপর সাদামোজা, সাদাজুতা পরে, ভারি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাবার সঙ্গে ছুঁটতো স্কুলে। ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সাথে খেলতো, গল্প করতো, তারপর বাড়ি ফিরে এক লম্বা ব্যস্তসূচি। গান শেখা, ড্রইং, বাসারকাজ আরও কত কী!
প্রিয়ন্তীর সেই ব্যস্তসূচিটা আজ খুব মনে পড়ছে। এখন বেলা ১০টার আগে তার ঘুম ভাঙে না। বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না বহুদিন। কথা হয় মুঠোফোনে। মাঝেমাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে খোলা আকাশ দেখার চেষ্টা করে মেয়েটা। ভালো দেখতে পায় না। টিভি, কম্পিউটার আর ডল-হাউজের সাথে কাটে তার জীবন। তবুও প্রিয়ন্তী বড্ড ভাগ্যবান। ওর বাসায় টিভি আছে, কম্পিউটার আছে, একটা মস্ত বিদেশি ডল-হাউজ আছে। অথচ স্কুল বঞ্চিত, স্বাভাবিক জীবন বঞ্চিত, কয়েক কোটি শিশুর ভাগ্যে হয়তো তাও জোটে নি।
একসময় ছুটির জন্য ব্যাকূল প্রতীক্ষায় থাকতো দেশের সাড়ে ৪কোটি শিক্ষার্থী। দিন গুণতো। কিন্তু এখন তাদের বিস্তর অবসর জীবন। গৃহবন্দি জীবন। জীবনে এক প্রচণ্ড একঘেয়েমি চলে এসেছে। ছুটি থেকে মুক্তি চাইছে ওরা। ওরা বিশ্বাস করে, এইতো আগামীকাল ঘুম থেকে উঠেই দেখবে পৃথিবী সুস্থ হয়ে গেছে। সেই পুরোনো বন্ধু-বান্ধব, স্কুল সবই আবার আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু হয় না। অনিশ্চিত সময় প্রতিদিনই প্রলম্ভিত হয়। সংকটটা বিশ্বব্যাপী। সংকটটা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবার জন্য সমান।
বর্তমান শিক্ষার্থীরাই আমাদের আগামী দিনের বাংলাদেশ। ফলে, ওদের ভালোথাকা, মন্দথাকা, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষর্থীদের সংকটের মাত্রাটা একটু ভিন্ন। তাদের সংকটকে মূলত দুটো অংশে ভাগ করা যায়; আজকের ও আগামীকালকের। যদি এই তরুণ প্রজন্মকে স্বাভাবিক রাখতে হয়, সুস্থ রাখতে হয় তবে এখনই তাদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
বর্তমান মূলসংকট ও সম্ভাব্য সমাধান
আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই বহন করে। কেউ টিউশনি করে, কেউবা অন্যকোথাও খণ্ডকালীন কাজ করে। কখনো কখনো তার উপার্জনে চলে তার পরিবারও। কিন্তু এই আকষ্মিক করোনার ছুটিতে তাদের সেই খণ্ডকালীন কাজ আপাতত স্থগিত। থমকে গেছে তাদের জীবনচাকা।
ফলে লাখো গৃহে এখন এক চরম অনিশ্চতা বিরাজ করছে। কারও কারও ঘরে হয়তো আজকের খাবার নেই, কারওবা আগামীকালকের। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীর জীবনে এখন চরম আর্থিক অনিশ্চতায় ভরা। প্রতিদিন অন্ধকারাচ্ছ পৃথিবীতে ঘুম ভাঙছে তাদের।
তাদের দ্বিতীয় সংকটটিও গভীর, যার অত্যন্ত দীর্ঘ প্রভাব পড়তে পারে তার জীবনে। যাদের ঘরে খাবার আছে এই সংকটটি মূলত তাদের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত প্রাঙ্গণ ছেড়ে এখন তারা ছোট্ট চারদেয়ালের মাঝে বন্দি। চার ইঞ্চি মুঠোফোনে বন্দি তাদের জীবন। ওটাই বিনোদন, ওটাই প্রয়োজন। এই একঘেয়েমি জীবনে তারা এখন বিপর্যস্ত। ওরা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। প্রচণ্ড বিষাদে ভূগছে, বিষন্নতায় ভূগছে। দম বন্ধ করা এইসময় তারা মুখোমুখি হচ্ছে আরও নানাবিধ শারীরিক সমস্যায়।
কী হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান? প্রথমত, তাদের ধৈর্যের সাথে সুস্থ পৃথিবীর জন্য প্রতীক্ষা করা। এই মহাসংকটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়াতে পারে তাদের পাশে। নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে পারেন শিক্ষকগণ।
সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমান সচ্ছল শিক্ষার্থী, বিভাগ ও বিভাগের শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী আর্থিক তহবিল গঠন করতে পারেন তারা। তারপর তা পৌঁছে দিতে পারেন অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মাঝে। সবসময় রাষ্ট্রের দিকে চোখপেতে রাখা শোভন দেখায় না। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাউন্টিং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগসহ আরও কয়েকটি বিভাগ ও অন্যকয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সচ্ছল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও এখন খুব জরুরি। তাদের উচিৎ ঘরের মধ্যে নানাবিধ বিনোদনের মাধ্যমে মনোজগতকে প্রসন্ন রাখা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রিয়জনের সাথে, বন্ধুদের সাথে সম্পর্কটা অবিচ্ছিন্ন ও নিবিড় করাও এখন সময়ের প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান
যদি সত্যিসত্যি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে, তবে অন্তত ছ-মাস পর পুরোনো ভূবনে ফিরে আসবে শিক্ষার্থীরা। চেনা ঘর, চেনা আঙিনাকে বড় বেশি অনেচা মনে হবে। সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। নতুন করে জেঁকে বসা একঘেয়েমি জীবনে নতুনত্ব আসবে, অথবা বলা যায়, ছন্দপতন হওয়া জীবন আবার ফিরবে সেই প্রত্যাশিত সূচিতে। নতুন করে ধাক্কা খাবে জীবন।
অলস জীবনে আসবে নতুন ব্যস্ততা। ধাতস্থ হতে কারও কারও বেশখানিকটা সময় লাগতে পারে। নতুন করে তাদের আবার জীবনের হিসেব মেলাতে হবে, সময়ের হিসেব মেলাতে হবে। আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলাতে হবে। নতুন করে আবার আয়ের উৎসগুলো খুঁজতে হবে।
অগোছালো জীবনকে আবার নতুন করে গোছাতে হবে। ধুলো জমে থাকা জীবনে আবার জীবন আঁকতে হবে, প্রাণ আঁকতে হবে। সেই জীবনে নতুন চ্যালেঞ্জ হবে পুরোনো আয়ের পথগুলো পুনরুদ্ধার করা। কাজটা খুব সহজ হবে না। সাথে জমবে নতুন করে প্রতিষ্ঠানিক পড়ালেখার চাপ। নিশ্চই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি চাপ দেবে। ফলে প্রশ্ন উঠবে, নতুন করে চলতে শুরু করা জীবন সেই বাড়তি চাপ সামলাতে পারবে তো?
মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা আবাসস্থলে ফিরে প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হবে তা হলো, মেসের বকেয়া সিট ভাড়া। যাদের সামর্থ আছে তাদের জন্য সমস্যাটা হয়তো ছোট, কিন্তু অন্যদের জন্য এ এক মহাসংকট। এইসময়ে মেস মালিকরা একটু মানবিক হলে সমস্যার সমাধান সহজতর হবে। মেস মালিকদের মনে রাখা দরকার, শিক্ষার্থীরা আকষ্মিকভাবে মেস ছেড়েছে। তারা জানতো না এই সংকট এতটা প্রলম্বিত হবে। জানলে হয়তো তারা মেস একেবারে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পারতো।
যদি তেমনটি হতো তাহলে তো মেস ফাঁকাই পড়ে থাকতো, কারণ মেস মালিকরা নতুন করে ভাড়াটিয়া পেতো না। ফলে যেহেতু তারা মেস ছেড়ে দেয়ার সময় পায় নি, এবং এই সংকটময় সময়ে নতুন কোনো ভাড়াটিয়া ওঠারও সম্ভবনা নেই। ফলে তাদের উচিৎ অত্যন্ত মানবিকভাবে বিবেচনা করে এই সমস্যার সমাধান করা। এই সংকটে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জেনে রাখা ভালো, যদি সমাধান না হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই ছাত্রাবাসে তার ছাত্রদের স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে পারে, যা ওই মেস মালিকের জন্য একটি স্থায়ী সংকট তৈরি করবে। ফলে উভয়ের উচিৎ ছাড় দিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা।
করোনা সংকটে নতুন যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে কোনো কোনো বিভাগের ভর্তি ও ফরম ফিলাপ। নতুন করে টাকা গুণতে হবে শিক্ষার্থীদের। আমাদের বাণিজ্যিক শিক্ষাব্যস্থায় সে টাকার পরিমাণও নেহায়েত কম নয়, যা পরিশোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এই সংকটে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিৎ প্রচুর পরিমাণ উপবৃত্তি চালু করা এবং অন্তত ১বছরের জন্য সকলপ্রকার ফি মওকুফ করে দেয়া।
একথা সত্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোটাদাগে তেমন সেশনজট নেই। তবে কোনো কোনো বিভাগে এখনও তার অস্তিত্ব বিরাজমান। কোথাও কোথাও তার পরিমাণটা একটু বেশি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর পরিমাণ আরও একটু বেশি। এই করোনা সংকটে আরও যোগ হচ্ছে অন্তত ছ-মাসের জট। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই সংকটের যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে হবে। আপাতত, সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়ে এক দিন করা যেতে পারে। বাড়তি ক্লাস পরীক্ষার ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি খেয়াল রাখতে হবে তা যেনো মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ না জোগায়। এসময় দু-একটি শর্ট সেমিস্টারের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
শেষকথা
সংকট কখনোই চিরস্তায়ী নয়। সংকট সবসময় নতুন করে বাঁচতে শেখায়। নতুন নতুন পথ দেখায়। করোনা সংকট কোনো জাতীয় সমস্যা নয়, বৈশ্বিক। ফলে, শক্ত হাতে, মানবিক হাতে মোকাবেলা করতে হবে করোনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংকটকে। সবাই হাতে হাত রাখলে, আমাদের পুরোনো বন্ধনগুলো জোড়া লাগলে করোনা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিতভাবে সম্ভব। আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী। তারা কখনো পথ হারায় নি। এই মহাসংকটেও তারা মনোবল হারাবে না। নতুন পথ খুঁজে নেবে। নিজেকে পথ দেখাবে, রাষ্ট্র ও সমাজকে পথ দেখাবে। আমাদের দায়িত্ব শুধু তাদের পাশে থাকা ও আশাবাদী হতে সাহায্য করা।
শ্রদ্বেয় উমর ফারুক স্যারের একটি লিখা।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এর সবচেয়ে বেশি পরিচিত মুখ❣



Comments
Post a Comment