করোনা যুদ্ধে জেলা প্রশাসকের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দৈনিক প্রভাত বাংলা

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দিনরাত এক করে কাজ করছেন নরসিংদী জেলা প্রশাসন। যার নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। জেলাবাসীকে নিরাপদে রাখতে করোনা ভাইরাসের শুরু থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ত্রাণ সহায়তা থেকে শুরু করে সার্বিক কার্যক্রমে স্থানীয় জন প্রতিনিধিসহ সর্বসাধারণের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে করোনা মোকাবিলায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন এ কর্মকর্তা।

সেসব কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করছেন, সে বিষয়ে জানতে চেয়ে আমাদের প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনে কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনা মোকাবিলায় নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনের কার্যক্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ভাইরাসের শুরু থেকেই তার সুদৃঢ় নেতৃত্বে ও উদ্যোগে গঠন করা হয় বিভিন্ন পরিকল্পনা। জেলার প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে ঘটন করা হয় ইমার্জেন্সি সেল কমিটি। পাশাপশি করোনা প্রতিরোধ,প্রতিকার ও আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় কুইক রেন্সপন্স টিম, এ টিমের কাজ হলো ,করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন,সৎকার, দাফন/ সৎকারের নির্ধারিত স্থান,পরিচ্ছন্নতা টিম ইত্যাদি জরুরী বিত্তিতে সম্পন্ন করা।

এ ছাড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের পরিবহন ও স্থানান্তরের জন্য স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ২ টি নৌ এ্যাম্বুলেন্সসহ ১১ এ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুতসহ নিরবিচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসক থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নরসিংদীবাসীকে ঘরে রাখতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ন্যায্যমূল্যে পৌঁছানোর লক্ষে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চালু করা হয়েছে অনলাইন শপ। পাশাপাশি ইউনিয়ন ভিত্তিক ভ্যানের মাধ্যমে ভ্রাম্যমান বাজার চালু করা হয়। এ ছাড়া একটি রেস্টুরেন্টের এক মুঠো আহার কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন অসহায়, গরীব ভাসমান, শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে বিনা মূল্যে খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়।

এ ছাড়া সার্বক্ষণিক জাতীয় হটলাইন ও জেলা প্রশাসনের হটলাইনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত নন এমন নিম্ম মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পরিচয় গোপন রেখে যাচাইয়ান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। করোনা মোকাবিলায় জেলার সকল হতদরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের খাদ্য সহায়তার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফার ২০ নম্বর নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সকলের যৌথ উদ্যোগে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পর্যায়ক্রমিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সকলকে মাস্ক পরিধানের জন্য ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, বাজার মনিটরিং, হোম কোয়ারেন্টাইন, লক ডাউন বাস্তবায়ন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ কতৃর্ক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সহায়তায় পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমান আদালত ও মনিটরিং। পাশাপাশি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে নরসিংদী জেলার কৃষি , শাক-সবজি, ফলমূল,  পোলট্রি ও ডিইরী শিল্পের উপর জেলার লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। খাদ্য চাহিদা নির্ভরের বিষয়টি মাথায় নিয়ে এ জেলায় এক ইঞ্চি ভূমি ও যেন অনাবাদী না থাকে সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট চাষিদের বীজ, সরবরাহসহ মৎস্য, প্রাণিজ ও কৃষিপন্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে আলোচনা পূর্বক প্রয়োজনী ব্যবস্থা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের নিকট থেকে ন্যায্য মূল্যে সবজি ক্রয় করে অসহায়দের বিতরণ করা হয়েছে।

করোনায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে গত ১০ মে থেকে নরসিংদী বিয়াম জেলা স্কুলে অনলাইন জুম পদ্ধতিতে পাঠদানের উদ্বোধন ও ১৬ মে থেকে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে জুম কনফারেন্সের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস পরিচালনা সংক্রান্ত ওয়ার্কশপ চালু করা হয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা ডিজিটালে মাধ্যমে অভ্যস্ত ও শিক্ষা কার্যক্রমে মনোযোগী হতে পারছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নরসিংদী চেম্বার অফ কর্মাস এবং সংশ্লিষ্ট সেক্টরের ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনাক্রমে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শর্তসাপেক্ষে গামের্ন্টস,টেক্সটাইল,পাওয়ারলুম,স্পিনিং ও অন্যান্য কল-কারখানা চালু করা হয়। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বৃহত্তর কাপড়ের বাজার শেখেরচর বাবুরহাটকে সীমিত আকারে স্বাস্ত্যবিধি মেনে হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করা হয়। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গণপরিবহন চলাচল সীমিতকরণ,আসন ব্যবস্থা মনিটরিং,সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা ও জরুরী পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে গণ-পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক সংগঠন এর প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভা করা হয়।

এ ছাড়া ও জোনভিত্তিক রেড,ইয়েলো ও গ্রিন জোন ভাগ করে লকডাউন তথা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সরকারের গৃহিত প্রধান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করছেন জেলা প্রশাসক। জোন ভিত্তিক লকডাউনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নরসিংদীর মাধবধী পৌরসভার উত্তর বিরামপুর ও দক্ষিণ বিরামপুর দুইটি ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষনা করে লকডাউন করা হয়। ১২ জুন লকডাউনের শুরুতে ১৮ জন রোগী থাকলে ও ২১ দিন পর জোন ভিত্তিক লকডাউনের সমাপনী দিনে তিনজন জন রোগী ছিল। যাদের পরর্বতী ৫ জুলাই সুস্থ ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ও দুই দিন ব্যাপী করোনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষন কর্মশালায় নরসিংদী জেলার কার্যক্রম তুলে ধরে ব্যাপক প্রশংসনীয় হন জেলা প্রশাসক। এ ছাড়া সামনে আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে পশুর হাট, হাটকে কেন্দ্র করে জালটাকা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে হাট পরিচালনার লক্ষ্যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসন কর্মকর্তারা। আর এসব কর্মকান্ড নরসিংদী বাসীকে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন জেলাবাসী।

জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন জানান, করোনা ভাইরাসের শুরু থেকে এখন অবধি নরসিংদীবাসীকে সুরক্ষা রাখতে মাঠ পর্যায়ে দিনরাত এক করে কাজ করছে প্রশাসনের প্রত্যেক কর্মকর্তারা। এ ছাড়া আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘অনলাইন বিক্রিকিনি’ নরসিংদীর কোরবানি হাট নামক ওয়েবসাইট ও ‘অনলাইন নরসিংদীর কোরবানি হাট নামক মোবাইল অ্যাপস’ চালু করা হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেই পশু সংগ্রহ করতে পারবে। অনলাইনে কুরবানির পশু বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক তরুণ খামারি ন্যায্য দামে তাদের গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া বিক্রি করতে পারবেন। মানুষ যেন প্রতারিত না হয় সেই জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদক
হাসমীর হোসেন
উপ-সম্পাদক
দৈনিক প্রভাত বাংলা
২৫ জুলাই,২০২০; শনিবার

Comments