সংসার সামলেও পেয়েছেন একাধিক সরকারি চাকরি, হয়েছেন বিসিএস ক্যাডার।।দৈনিক প্রভাত বাংলা

নাবীন মাছুম,কিশোরগঞ্জ।।
২১ জুলাই ২০২০ ইং 
     

মানবসভ্যতার চরম উৎকর্ষের এ যুগে করোনা মহামারীর আগমন যেন এক দমকা হাওয়ার মতো।লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে সমাজ সংসার সবকিছু,কেউ জানেনা কখন ফের ফিরে আসবে সভ্যতার প্রাণস্পন্দন। এতো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনকল্যানে (চিকিৎসক,স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ,সাংবাদিকসহ) লড়ে যাচ্ছেন যারা, তারাই সময়ের সাহসী প্রজন্ম।তেমনি একজন সম্মুখসারির মানবিক যোদ্ধা চিকিৎসক ডাঃমারেফা তুজ জোহরা লিমা।  

বর্তমানকে ছাপিয়েও রয়েছে তার সমুজ্জ্বল সংগ্রামী অতীত।ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিলো মানুষের অপার সেবা করার।কখনো কল্পনা এঁকেছেন নিজের একান্ত চিত্তে,কখনো বা লিখেছেন পরীক্ষার উত্তরপত্রে,ডাক্তার কিংবা শিক্ষক হওয়ার সেসব লালিত স্বপ্নের কথা।সে ইচ্ছা থেকেই নিজেকে গড়েছেন একটু একটু করে। সে স্বপ্নের ফসল ৩৯ তম বিসিএস এ স্বাস্থ্য ক্যাডার হয়ে জনসেবায় নিয়োজিত আছেন কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে। তবে আজকের এ অবস্থানে আসতে তাকে পার হতে হয়েছে জীবনের অনেক  চড়াই উৎরাই। এক হাতে স্বামীর সংসার আরেক হাতে নিজের ক্যারিয়ার, দুটোই সামলেছেন সমান তালে।সফলতার এ গল্পটি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার মেয়ে ডাঃ মারেফা তুজ জোহরা লিমা এর।

নজরকাড়া এ সাফল্যের চূড়ায় কীভাবে নিজেকে নিয়ে গেছেন, নিজ মুখেই জানান সেসব কথা।
শুরুটা ছিলো নিতান্তই গতানুগতিক। ছাত্রজীবনটাও ছিলো যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। মাধ্যমিক পাশ করেন অগ্রণী স্কুল এণ্ড কলেজ,ঢাকা থেকে ২০০৫ সালে আর উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন হলিক্রস কলেজ,ঢাকা থেকে ২০০৭ সালে।পরবর্তীতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এ ভর্তির পর ২য় বর্ষেই তার জীবনে নেমে আসে এক ভয়াল শোকাতুর ছায়া।বাবা মোঃআব্দুল মান্নান মল্লিক ছিলেন একাত্তরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা,বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন এর উপপরিচালক পদে দায়িত্বে থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন। পিতৃবিয়োগের এই নির্মম শোক কে শক্তিতে পরিণত করে তার MBBS সম্পন্ন করেন।
এরই মধ্যে ২০১১ সালে ৩য় বর্ষের ছাত্রী থাকাকালীন আবদ্ধ হন নতুন মায়ায়।সংসার বাঁধেন কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সন্তান তেজগাঁও কলেজ এর গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ড.মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর সাথে। 
এভাবেই সংসার আর ক্যারিয়ার নিয়ে চলছিলো তার গভীর স্বপ্নবিলাস তবুও পিছপা হননি মানবসেবার সংকল্প থেকে। MBBS পাশ করে প্রথমে যোগ দেন আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ এণ্ড হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে। পরে চাকরি হয় স্কয়ার হাসপাতালে এবং তারপর সরকারি চাকরি বিপিএসসি(bpsc)এর মাধ্যমে যোগ দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরে। MO(MCH-FP) হিসেবে ২০১৬ সালে কিশোরগঞ্জ এবং পরে ঢাকার সাভারে কাজ করেন তিনি।এরই মধ্যে, ২০১৭ সালে আবারো সরকারি চাকরি হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে মেডিকেল অফিসার হিসেবে তবে সেখানে আর যোগদান করা হয়নি।তারপরেই আসে সোনালী দিন।৩৯ তম বিসিএস এর মাধ্যমে উত্তীর্ণ হন স্বাস্থ্য ক্যাডারে এবং যোগদান করেন নিজ শ্বশুরবাড়ি কিশোরগঞ্জের জেলা সদর হাসপাতালে।তাছাড়া গত বছর নভেম্বরে এমডি (MD) পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি কোটায় ৫টি সিটের বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করেছেন।বলা প্রাসঙ্গিক যে,তার সাফল্যগাথার এই পথ পরিক্রমায় সংসার আলোকিত করে ২০১৪ সালে প্রথম ও ২০১৬ সালে দ্বিতীয় সন্তান (ছেলে) এর জন্ম হয়।
তিনি বলেন,"চাকরি,সমাজ  সংসার সামলে এই অবস্থানে আসা আল্লাহর রহমত ছাড়া আমার জন্য সম্ভব  ছিলো না।আমার বাবার স্বপ্নপূরণে পুরো যাত্রাপথে  অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন আমার স্বামী। মায়ের দোয়া ছিল অনেক।মা,ভাই বোনের সহযোগিতাও ছিল ।তাছাড়া আমি আসলেই অনেক ভাগ্যবতী, আমার শাশুড়ি সহ শশুর বাড়ির সবাই সবসময় আমার প্রতি আন্তরিকতা দেখিয়েছেন এবং উৎসাহ জুগিয়েছেন।পড়াশোনা নিয়মিত করতে না পারলেও যতটুকু করেছি তার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছি। অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের সাথে যে বিষয়টি আমি সর্বদা ধারণ করেছি তা হলো ধৈর্য। এসময় নতুনদের উদ্দেশ্যে তিনি যথাযথ অধ্যবসায় এর পাশাপাশি নিজের উপর আস্থা রাখারও পরামর্শ দেন এবং দেশ ও দশের সেবায় বরাবরের মতোই নিজেকে নিয়োজিত রাখতে সবার দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেন "।

Comments