আসল পর্দা ও নকল পর্দা (কলমে হাবিবা ইসলাম মীম) দৈনিক প্রভাত বাংলা

চলুন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করি।

বেপর্দায় যারা ছবি আপলোড করে তাদের একদিকে রাখি, আর পর্দা করে যারা ছবি আপলোড করে তাদের অন্যদিকে রাখি।

প্রথমে আসি বেপর্দায় যারা ছবি আপলোড করে তাদের কথায়। তারা সুন্দর করে সেজেগুজে নিজেকে পরিপাটি করে হাজার হাজার ছবি তুলে বেছে বেছে সুন্দর এক দুইটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করে। কেন করে? কারণ এই বেপর্দা নারীদের স্বভাব হচ্ছে নিজেদের সৌন্দর্যকে প্রদর্শন করা। পর-পুরুষকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করা। সেটা বাইরে বের হলে কিংবা ভার্চুয়াল জগতে। নিজেদের রূপ সৌন্দর্য চুল শরীরের আকৃতি যাবতীয় কিছু পুরুষ-নারী সকলকে দেখানোই হল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

তাদের ছবি আপলোড করার এই মূল কারণ আমরা সবাই জানি এবং বুঝি। এই বিষয়টা একদম ক্লিয়ার।

তাদের এই উদ্দেশ্য কিংবা কারণটি জঘন্য এবং নিকৃষ্ট সেখানে কোন সন্দেহ নেই। সেই কথায় যাবো না, আমরা শুধু কারণটা জেনে নিলাম।

এখন আসি যারা পর্দা করে ছবি আপলোড করে। তাদের কারণ খুঁজতে চাই। তারা ঠিক কি কারণে ছবি আপলোড করে? 

আমরা একজন পর্দানশীল নারী, তার মানে আমাদের দুটো চোখ বাদে যাবতীয় সব কিছু ঢাকা থাকবে। হাতের কব্জি খোলা থাকলে সমস্যা নেই তবে ঢেকে রাখা উত্তম।  তাহলে আমরা পর্দানশীল নারীরা ঠিক কি কারণে কিংবা "কি" দেখাতে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড করি? আমরা কি শুধুমাত্র মানুষকে এটাই দেখানোর উদ্দেশ্যে ছবি আপলোড করি যে, "আমরা পর্দা করে চলি"? 
তাহলে তো এটা ইবাদত হলো না। আমরা কি তাহলে মানুষকে দেখাচ্ছি যে আমরা পর্দা করে চলি? মানুষের প্রশংসা আর বাহবা পাওয়াই কি আমাদের মূল লক্ষ্য? তাহলে তো এগুলো রিয়া তথা লোক দেখানো ইবাদত এ পরিণত হচ্ছে!!

একজন পর্দানশীন নারী ছবি আপলোড করার পেছনে ভালো কিংবা খারাপ কোনো কারণই নেই, যুক্তিও নেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে হ্যা, নারীরা নারীদের জন্য পর্দা করে ছবি আপলোড করতে পারে। পর্দা কিভাবে করতে হয়, কি ডিজাইনের বোরকা পরা উচিত, কিভাবে পড়া উচিত, সেগুলো অন্য বোনদের দেখানোর জন্য ছবি আপলোড করা যেতেই পারে। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখা উচিত এটা ভার্চুয়াল জগত। এখানে যেকোন ভাবে যেকোনো পুরুষ এই ছবিগুলো দেখতে পারে। আর পুরুষ নারীদের ছবি দেখছে মানে এটা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

আমরা অনেকে অজুহাত দেই যে, পর্দা করে ছবি আপলোড করি যেন অন্য বেপর্দা নারীরা অনুপ্রাণিত হয়। 
অথচ বোন, আমরা কখনো এভাবে ভেবে দেখেছি কি যে পর্দা একটি ইবাদত! আল্লাহ যখন হেদায়েত দান করবেন তখনই একজন বেপর্দা নারী পর্দা করে চলবে। একজন বেপর্দা নারীকে পোশাকের সৌন্দর্য দেখিয়ে পর্দা করার জন্য অনুপ্রাণিত করার প্রয়োজন নেই। একজন নারী যখন আসলেই হেদায়েত প্রাপ্ত হবে এবং তার নিয়ত থাকবে শুধু মাত্র পর্দা করা, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা না, তখন সে এমনিতেই পর্দা করে চলবে। পর্দা করার ব্যাপারে নসিহত করা যেতে পারে কিন্তু আমরা এই বোকামি করে অন্যের অনুপ্রাণিত হওয়ার কারণ হতে গিয়ে নিজেদেরই আমলনামায় গুনাহের খাতা ভারী করছি না তো?

আমরা পর্দা করে ছবি আপলোড করবো না কেন?

১. আমরা যখন সাধারণত পর্দা করে বাসা থেকে বের হই এবং সেটা একান্তই নিজেদের প্রয়োজনে তখন আমরা স্থির অবস্থায় থাকি না। কাজেই পর্দানশীল একজন নারীর দিকে কারো তাকিয়ে থাকার সময় নেই। কিন্তু যখন পর্দা করে ছবি আপলোড করছি তখন আমাদের ছবি স্থির অবস্থায় আছে। ফলে কোন পুরুষ যদি ছবিগুলো খানিকটা সময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে তাহলে খুব ভালো ভাবেই সেই পর্দানশীল নারীরকে আন্দাজ অনুমান করতে পারবে। এতে নিশ্চিত পর্দা নষ্ট হয়। গুনাহ এবং ফিতনা সৃষ্টি হয়।

২. মা ফাতেমা (রাঃ) বলেছিলেন, 
"আমাকে যেন রাতের বেলায় দাফন করা হয়।
কারণ, আমি চাই না দিনের আলোতে কেউ আমার শরীরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ দেখুক।" 

তার মানে আমাদের স্পষ্ট ভাবে বোঝার কথা ইসলাম আমাদের ঠিক কিভাবে পর্দা করার হুকুম দিয়েছে। আমরা যখন পর্দা করে ছবি আপলোড করছি তখন আমাদের শরীরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ এমনকি গায়ের রং, চোখ, যাবতীয় কিছু পুরুষরা খুব সহজেই অনুমান করতে পারে কারণ ছবিগুলো স্থির। এতে করে পর্দা নষ্ট হয়।

৩. আল্লাহ সূরাহ আহযাব এ মুমিন নারীদের বলেছেন, "আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে"
তারমানে বেশিরভাগ সময়ই আমাদের নিজ গৃহে অবস্থান করার কথা কুরআনে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এটা পর্দার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে মেয়েদের বলা হয় সফর করলে মাহরামের সাথে যেতে হবে, অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার দরকার নেই, সেখানে আমরা মেয়েরা পর্দা করে অনবরত ছবি আপলোড করি ঠিক কোন যুক্তিতে?

৪. ফকিহগণের নিকট একটি  স্বীকৃত মূলনীতি হল, "লাভের চেয়ে ক্ষতি রোধের গুরুত্ব বেশি।" আর একজন সচেতন মুসলিম নারী মানেই এটা বুঝতে পারার কথা যে, ইন্টারনেটে নিজেদের এ জাতীয় ছবি আপলোড করার মাঝে কোন জরুরাত কিংবা বেনেফিশিয়াল কিছু নেই। যা আছে তা হল ফিতনা এবং নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা। যেখানে নিজেদের কোনো লাভ নেই বরং ক্ষতি, সেখানে একজন মুমিন নারীর ত্রিসীমানায় থাকারও কথা না! অথচ আমরা পর্দানশীল নারীরা আজ কোথায়?

৫. উপরোক্ত বিষয় সমূহ পড়ে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি পর্দা করে ছবি আপলোড করার কোনো মানেই হয় না, সেখানে নিজের হাত পা কিংবা হাতে মেহেদী চুড়ি পরে ছবি আপলোড করা তো অনেক দূরের বিষয়, কারণ এগুলোও পর্দার অংশ। আর নিজেদের সৌন্দর্যকে আড়াল করাই পর্দার মূল উদ্দেশ্য।

৬. নিজের পর্দানশীল ছবি না দিলেও অন্যের পর্দানশীল ছবি দিয়ে রাখি। এটা করা চলবে না। আমরা কেনো শুধু শুধু অন্যের গুনাহ এর ভাগীদার হব? আমরা যেটা নিজেদের সাথে পছন্দ করছি না সেটা অন্যের সাথে কোনো করবো? কেনো আমরা ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করবো শুধুমাত্র অন্যের ছবিগুলো ব্যবহার করে?

এক কথায় নিজের কিংবা অন্যের, কোনো নারীর ছবিই আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করবো না শুধুমাত্র আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহকে খুশি করতে, নিজেদের নফস কে বাঁচাতে এবং একান্তই নিজেদের স্বার্থে।

বোন, পর্দা যখন করছি রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই করি? একটু সহিহ ভাবেই করি? ভালো কাজ করলে সম্পূর্ণরূপেই করি? কেন ৫০ ভাগ করে বাকি ৫০ ভাগ শূন্য রেখে দিব? এটা কি একজন মুমিনাহ এর সাথে মানায়? কখনোই না!💐💐

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান 💖💖

কলমে
হাবিবা ইসলাম মীম 
নারী বিষয়ক সম্পাদিকা
দৈনিক প্রভাত বাংলা,
ক্যাম্পাস এম্বাসেডর
প্রভাত বাংলা টিভি (যশোর বিঙ্গান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়)

Comments